গোপেশ্বর মহাদেব এর কাহিনী
শরৎ পুর্ণিমায় শরৎ উজ্জ্বল চাঁদনীতে বংশীবটে যমুনা তীরে শ্যামের বাঁশী বেজে উঠল। তখন শ্রীকৃষ্ণ-রাধারাণী আর অন্য গোপীদের রাসলীলা দেখার জন্য দেবাদিদেব মহাদেব নিজের সমাধি ভেঙ্গে কৈলাস থেকে বৃন্দাবনের নিধুবন চলে আসেন। অত্যন্ত উৎসাহের সাথে মহারাসে অংশ নেওয়ার জন্য মহাদেব নিধুবনে রাসস্থলীর প্রবেশ দ্বারে আসলেন। কিন্তু তিনি প্রবেশ দ্বারে স্বয়ং যোগমায়া দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত হলেন।
যোগমায়া মহাদেবকে বললেন “শ্রীকৃষ্ণ কোন পুরুষকে এইখানে প্রবেশ করার অনুমতি প্রদান করেন নি। প্রথমে তোমার গোপী রূপ প্রাপ্ত হতে হবে, তখনই তুমি প্রবেশের যোগ্য বলে গণ্য হবে“। তখন মহাদেব জিজ্ঞাসা করলেন "কিভাবে আমি গোপীরূপ প্রাপ্ত হতে পারি ?" যোগমায়া প্রতি উত্তরে বলেন “তুমি বৃন্দাবনের যমুনাতে স্নান করে যমুনা দেবীর শরণ গ্রহন কর, তিনি তোমাকে অবশ্যই গোপী হওয়ার বাসনা পূর্ণ করবে“। তারপর যোগমায়া তাকে যমুনা দেবীর কাছে পাঠান।
অতঃপর সেখানে স্নান করার পরে মহাদেব একজন অসাধারন সুন্দর এক গোপীর অবয়বে নিজেকে আবিষ্কার করলেন। মহাদেবের ইচ্ছা দেখে যমুনা দেবী তাকে গোপী রূপে শোভিত করেন। মহাদেব গোপীরূপ হয়ে গেলেন। প্রসন্ন মনে গোপীদের মধ্যে প্রবেশ করে প্রবেশ দ্বারে মহাদেব গোপী হয়ে প্রবেশ করলেন।
মহাদেব মোহিনীবেশে রাসস্থলীতে পৌঁছে অতৃপ্ত নয়নে বিশ্বমোহনের রূপ-মাধুরী পান করতে লাগলেন। বিশ্বমোহন মোহিনী বাঁশী এমন বাজল, তা শুনে নিজেকে নিজে ভুলে গেলেন ভোলেনাথ, শ্রীরাসবিহারী সাথে রাসেশ্বরী, রসময়ী রাধারাণী ও গোপীদের নৃত্য দেখে ভোলেনাথ নিজে নৃত্য করতে লাগলেন।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চিনে ফেলেন ভোলেনাথকে। তখন শ্রীকৃষ্ণ রাসেশ্বরী রাধারাণী ও গোপীদের ছেড়ে ব্রজের বনে লতার মাঝে গোপীরূপধারী গৌরীনাথের হাত ধরে আর মন্দ মন্দ হেসে খুব আদর করে বললেন, "এস স্বাগত, মহারাজ গোপেশ্বর"। রাধারাণী মহাদেবের এই মোহিনী গোপী রূপ দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলেন, শ্রীকৃষ্ণ বললেন, রাধে, ইনি কোন গোপী নয়, ইনি তো সাক্ষাৎ ভগবান শংকর, আমাদের মহারাস দর্শন করতে গোপীরূপ ধারণ করে এসেছেন।
মহারাস শেষ হওয়ার পর তিনি রাধারাণীর সাথে মহাদেবের গোপী রূপের আরাধনা করেন এবং তাকে এই রূপে ব্রজে থাকতে অনুরোধ করেন। মহাদেব তাঁদের আরাধনার অনুরোধ মেনে নিলেন। তখন রাধারাণী তাঁর এই রূপের নাম দেন গোপেশ্বর মহাদেব। যমুনার তীরে ভগবান শংকর গোপেশ্বর মহাদেব রূপে বিরাজিত হলেন। রাধারাণী বললেন, গোপেশ্বর মহাদেবের দর্শন বিনা বৃন্দাবন দর্শন পূর্ণ হবে না।
সেই থেকে মহাদেবের এই গোপেশ্বর মহাদেব রূপ আজও বৃন্দাবনে বিরাজমান। এখানে মহাদেবের মূর্তি নারীর মতো শোভা পাচ্ছে। এটিই পৃথিবীর একমাত্র মন্দির যেখানে মহাদেব নারী রূপে অবস্থান করেন। এখানে প্রতিদিন শিবলিঙ্গকে জল, দুধ, দধি, পঞ্চামৃত দিয়ে রুদ্রাভিষেক আর পূজা-অর্চনা হয়। সকাল বারোটা পর্যন্ত লিঙ্গ হিসেবে পূজিত হন বিকাল পাঁচটা থেকে নিত্য শিবলিঙ্গকে গোপীরূপে শৃঙ্গার করা হয়।
আজও এই মন্দিরে গোপীর মতো শিবের ষোলটি অলংকরণ করা হয়। তার পরই তার পুজো করা হয়। এটি একমাত্র শিবলিঙ্গ, যেখানে শিবলিঙ্গকে লহংগা, আড়না(ওড়না), ব্লাউজ, কানের দুল, নাকের নোলক, টিকলি, কাজল, টিপ এবং মহিলাদের আরও অনেক প্রসাধনী দিয়ে নিত্য শিবলিঙ্গকে গোপীরূপে শৃংগার করা হয়।
বৃন্দাবনে যমুনা কিনারে বংশীবট কাছে গোপেশ্বর মহাদেব মন্দিরটি পাঁচ হাজার বছরের পুরাতন। কথিত আছে গোপেশ্বর মহাদেব মন্দিরটি ভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রপৌত্র বজ্রনাভ মহর্ষি শাণ্ডিল্যের সহযোগে নির্মাণ করেন। পার্বতী, গণেশ আর নন্দী আদি গর্ভ মন্দিরের বাহিরে বিরাজমান আছে। মহাদেবের এই অপরূপ গোপেশ্বর রূপ দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে বৃন্দাবনে আসা ভক্তরা আসেন এই মন্দিরে।


