তন্ত্রের সরলীকরণ প্রসঙ্গে আমার অভিমত

Jyotishraj Suvrajit Singha
0


আমি শুরু থেকেই এই পন্থা মেনে চলি যে তন্ত্রের সরলীকরণ অবশ্যই প্রয়োজন , ইনফ্যাক্ট শুধু তন্ত্র কেনো যোগ তন্ত্র উভয়ের সকল ক্রিয়া এর সরলীকরণ প্রয়োজন , এখানে মাথায় রাখতে হবে সরলীকরণ মানে এর সমস্ত বিষয় অপাত্রে দান করে নষ্ট করা নয় বরং সঠিক পাত্র বুঝে সঠিক বিষয় সমহ উন্মোচন করা ।

তন্ত্রের সরলীকরণ এবং কিছু ভুল ধরনা 

একদা এক সন্যাসী (গঙ্গা সাগর এর মেলায় দেখা হয়েছিল) একটি খুবই ভালো কথা  বলেছিলেন যেটা আমি নিজেও বিশ্বাস করি যে -

" বর্তমানে যত না মানুষ বিনা পূজা পাঠ করে ভোগে তার থেকে বেশি মানুষ ভুল ভাল নিয়ম কানুন করে পূজা পাঠ সাধনা করতে গিয়ে ভোগে " 

শুনতে কটু হলেও এটাই সত্যি ।

এবং এটা হওয়ার একমাত্র কারণ হলো এই যে তন্ত্র বিষয় টা কে সর্বদা অতিগুপ্ত প্রয়োজনের অতিরিক্ত জটিল ও একটি ভয়নক বিষয় হিসাবে সকলের কাছে তুলে ধরা হয় , তাই বহুকাল থেকেই যারা কিছুই যায় না তাদের কাছে তন্ত্র মন্ত্র মানেই ত্রাসের বা ভয়ের ব্যাপার আর যারা জানতে চায় তাদের কাছে যে ইনফরমেশন আসে সেটা এতই জটিল ভাবে প্রতিস্থাপিত যে সে নিজেই মাকড়শার জলে জড়ানো এর মত ভাবে ।

অবশ্যয় তন্ত্র গোপনীয় বিষয় এটা জনসার্থে প্রচার করার বস্তু কখনো নয় , কিন্তু যে একে ধারণ এবং পোষণ করার যোগ্যতা রাখে তার কাছেও পৌঁছেবে না বা ভুল ভাল জ্ঞান পৌঁছবে এতটাও গুহ্য রাখার মানে কি আছে আপনারাই বলুন । 

এবার আসি "গুহ্যাতিগুহ্য" এবং "না দাত্যাবাং" "না প্রকাশং" ইত্যাদি বিষয় গুলি নিয়ে তন্ত্রে বহু স্থানে এরূপ উবাচ শিব নিজেই করে গিয়েছেন যার ফলে আমরা এটা ভেবে থাকি যে দেওয়া যাবে না বা প্রকাশ করা যাবে না , কিন্তু কখনো এটা ভবি না , যে যিনি মহাকাল কালের ও কাল তিনি যেটা দেওয়ার নয় সেটা প্রকাশ করতেই বা গেলেন কেনো ? এর আগেও বহুবার বলেছি আমাদের শাস্ত্রের দুই ধরনের অর্থ হয় শব্দার্থ আর ভাবার্থ আমরা একটি ভাবার্থ এর দিকে যাবো , কারণ শাস্ত্র জ্ঞানী নয় আমি , যা সাধু গুরু সঙ্গ করে মনে ভাব আসে বা  বুঝি তাই লিখি ।

এই বিষয়ে একটা উদাহরণ দিয়ে আরেকটু ভেঙে বলি যদি বোঝাতে পারি , আশাকরি আপনাদের বুঝতে সুবিধা হবে - 

আপনারা ডান বা ডাইনি দের বিদ্যা সমন্ধে জানেন কি , না জানলে বলে রাখি ওরা এমন অনেক জরি বুটি বিদ্যা বা শেকড় বাকর জানে এবং এমন অনেক মন্ত্র জানে যা আপনি সব তন্ত্রের বই ঘেঁটে ফেললেও পাবেন না , এর কারণ কি ?

কারণ  এগুলি আসুরি বিদ্যা এগুলি জন কল্যাণে লাগে না তাই অঘরেস্বর শিব এগুলি দেন নাই , যারা ডাইন যোনি বা ডাকিনী যোনি তে যান তারাই জানেন ।  মহাদেব সব ক্ষেত্রেই একই কথা বলছেন - হে দেবী জগতের কল্যাণের জন্য আমি এই বিষয় সমুহ প্রকাশ করলাম , এর মানে এই যে- 'যে বিদ্যা গুলি প্রকাশ করা হয়েছে তা জগৎ কল্যাণের জন্য এবং সেটা লুকিয়ে রাখার জন্য প্রকাশ করা হয়নি , তাকে সৎ পাত্রে দিতেই প্রকাশ করা হয়েছে , বরং সেটা না দিলেই সমস্যা ।' আর যেটা দেয়ার না গোপন রাখার তন্ত্র মন্ত্র, যেটা জগতে এলে ত্রাহি ত্রাহি মাচিয়ে দেবে সেসব আমরা পাই নাই ,তিনি নিজেই লুকিয়ে রেখেছেন। যারা ওই ডান ডাকিনী যোগিনী সিদ্ধ হয় তারাই পায় । এই যে উপরে উদাহরণ টা দিলাম , বুঝেছেন আশাকরি । এবার অনেকে মারণ ইত্যাদি ক্রিয়ার কথা ভাবতে পারেন যে এটাও ত ক্ষতিকর,  কিন্তু ব্যাপার হলো এটা যে কেউ যে কাউকে করলেই কাযে লাগে না এমন ব্যবস্থা করেই  মহাদেব দিয়েছেন তাছাড়া আরো বহু বিষয় আছে বোঝার ।

আরেকটি উদাহরণ দি - just ধরুন আপনার কাছে মৃত সঞ্জীবনী সিদ্ধি আছে আপনি সেটা দ্বারা অনেকের ব্যাধি নিরাময় করতে পারবেন বা বাঁচাতে পারবেন , অথচ আপনি যাওয়ায় আগে ( দুনিয়া ছেড়ে ) এটা গুহ্যাতিগুহ্য বিষয় তাই কাউকে শিখিয়ে দিয়ে গেলেন না  বা এর সরলীকরণ করলেন না যাতে কেউ বুঝতে না পারে , এতে হলো কি জগৎ কল্যানকারী একটি বিদ্যা কালের গ্রাসে চলে গেলো ,

                 আপনি প্রভুর বলা একটা কথার মান তো রেখে নিলেন এটাকে গোপন রেখে কিন্তু যে মূল উদ্দেশ্য নিয়ে প্রভু আমাদের এই বিদ্যা গুলি দিয়েছেন জগৎকল্যান সেটাই তো থেমে গেলো । মানে একটা শব্দের মান রাখতে গিয়ে আপনি আরেকটা শব্দের মান রাখতে পারলেন না , এতে কি প্রভু প্রসন্ন হবেন নাকি আপনাকে প্রশ্ন করবেন ? ( কাউকে আঘাত করার জন্য বলা হয় নি পার্সোনালি নেবেন না )

অর্থাৎ মহাদেব যেমন গুপ্ত রাখতে বলেছেন তেমন এটাও তো বলছেন যে জগৎ কল্যাণের জন্য দেওয়া কই সেটা আমাদের তো মনে পড়ছে না , আমি শিখে যদি ৪০ জনের কল্যাণ করি আর আমি উপযুক্ত পাত্রে simplify করে দিয়ে শিখিয়ে দিলে যদি ৪০০০০ লোকের কল্যাণে লাগে তাহলে simplify করে দোষ কোথায় বলুন ত ? তাই জগৎ কল্যাণের আর গুহ্যাতিগুহ্য এর মধ্যে আমি আমার সীমিত জ্ঞান দ্বারা জগৎ কল্যাণ কে গুরুত্ব দেবো ।




অতিরিক্ত গোপনীয় রাখার কুফল 

 1. অতিরিক্ত গোপনীয় রাখতে গিয়ে বহু সাধনা লুপ্ত হয়ে গিয়েছে । যেমন ধরুন বীরভদ্র তন্ত্রকত সর্বেস্বরি সাধনা ।

 2. অনেক স্থানে শক্তি পূজার নিয়ম জানা সাধক এর অভাব দেখা যাচ্ছে ।যেমন ধরুন-আমার জানা দেশে মাত্র ১ টি স্থানে কৃত্যা দেবীর মন্দির আছে কিন্তু এর সাধক কই , একজন বুড়ো সাধক তবু করে যাচ্ছেন কারণ কৃত্যা এক মহা মহা শক্তিশালী শক্তি এর পূজা যার তার দ্বারা হয় না ( আগামী দিনে কৃত্যা দেবীর আবির্ভাব শক্তি পূজা ইত্যাদি নিয়ে লিখবো তখন বুঝতে পারবেন )

 3. বহু অন্য ধর্মের নিয়ম কানুন আমদের তন্ত্রের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে সাধারণ ব্যক্তিরা সেটা বুঝতেও পারছে না । 

 4. প্রকৃত জ্ঞান না থাকার ফলে , লোকে ইন্টারনেট ইত্যাদি দেখে আর তরানাথ এর গল্পঃ শুনে উল্টো পাল্টা সাধনা করতে গিয়ে নিজেও মরছে অন্য কেউ মারছে

 5. অনেক তন্ত্র শুধু পুস্তকেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে , যেমন কুরুকূল্লা সাধনা , মহা বজ্র যোগিনী সাধনা , ধুম্র বারহি সাধনা , বগলা পঞ্চাস্ত্র সাধনা ,  বগলা পরবীদ্যা ভক্ষিনী (paravidya vakshini) সাধনা , বীরভদ্র কল্প , ধন্বন্ত্রী কল্প সাধনা ইত্যাদি , শুলীনি দুর্গা মহবন্ধন সাধনা ,  আরো অনেক অনেক কতই বা বলি ।

আরো অনেক কুফল আছে লিখতে গেলে ছোটো ম্যাগাজিন হয় যাবে , আর লেখার প্রয়োজন নেই এবিষয় আপনারাও জানেন ।

ফিরে আসি মূল বিষয়,

 তন্ত্রের সরলীকরণ কিভাবে করা উচিত (আমার মতে)

 ----------

সবথেকে গুরত্বপূর্ন বিষয় হলো এই যে -- "যে বিষয়গুলি শিক্ষণীয় সেই গুলির সরলীকরণ করতে হবে , যে বিষয় গুলো আত্মিক উপলব্ধি করার সেগুলি ভাঙার দরকার নাই , ব্যাক্তি প্রভু কৃপা থেকেই সেগুলি জানুক উপলব্ধি করুক  "

কতিপয় ব্যক্তিদের যোগ্যতা যাচাই করে নিয়ে তাদের আলাদা স্থানে কোনো ফেসবুক বা ইউটিউব এর দ্বারা নয়, অন্য কোনো স্থানে  পাত্র ও যোগ্যতা বুঝে প্রকাশ করতে হবে ।

তন্ত্রের সরলীকরণ এর লাভ কি হবে 

 1.  তন্ত্র মন্ত্র নিয়ে অনেকের মধ্যে ভয় আছে তন্ত্র মানেই তারা যাদু টোনa ভাবে এই ভুল ধারণার মুক্তি করা যাবে এইজন্য সরলীকরণ করতে হবে 

 2. তন্ত্রের দ্বারা চমৎকার করে রাতারাতি ভাগ্য বদলাবে এই ভুল ধারণার মুক্তি করা যাবে এইজন্য সরলীকরণ করতে হবে ।

 3. তন্ত্রে আগ্রহী ব্যক্তির প্রতারিত না হতে হয় ভুল ভাল জ্ঞান পেয়ে এইজন্য সরলীকরণ করতে হবে ।

 4. তন্ত্র ও দীক্ষার নামে ব্যবসা এর দ্বারা মানুষ তন্ত্রের প্রতি আস্থা হারিয়ে যাতে না যায় সেটা মাথায় রেখে সরলীকরণ করতে হবে । এই তো গতকাল একজন আমাকে ইনবক্স করলো যে তাকে নাকি কোন একজন মোবাইল e দীক্ষা দিয়েছেন , ভাবুন একবার । 

 5. তাছাড়া তন্ত্র শিখলেই সকলের সব সমস্যা সমাধান করতে পারবে অনেকে এটা ভাবে , যদিও সৃষ্টির নিয়ম বলে সব সমস্যার সমাধান কখনোই কেউ করতে পারবে না । তাই তন্ত্র জানলেই আমি সব অসম্ভব কে সম্ভব করে নেবো এই ভুল ধারণা মুক্ত সমাজ গড়তে পারে যায় সেটা মাথায় রেখে সরলীকরণ করতে হবে ।

 6. জীবনের সব ছোটো খাটো বিষয়েই তন্ত্র মন্ত্র খাটাতে হবে এরকম চিন্তা যাতে না আসে বা সর্বদা ক্রিয়া কর্ম ষটকর্ম করতে হবে এমন চিন্তা যাতে না আসে সেটা বোঝানোর মতন করে সরলীকরণ করতে হবে । কারণ এই কদিন আগেই fb te দেখলাম একজন বলছে , মোবাইল বার বার খারাপ হলে কি মন্ত্র উপায় করা উচিত , তন্ত্র টা এতটাও পাতি না হয়ে যায় ।

 7. প্রকৃত তন্ত্র ও ষটকর্ম এক বিষয় নয় সেই পার্থক্য টা বুঝানোর জন্য ও সরলীকরণ প্রয়োজন ।

 8. সর্বোপরি সব দিক থেকে জ্ঞানের সরলীকরণ দ্বারা সচেতনতা তন্ত্রের প্রতি না বাড়ালে এটা নিয়ে যে ব্যবসা এর ব্যভিচার চলছে সেটা মিটবে না এবং এটা তাহলে সকল প্রকৃত তান্ত্রিক ও সাধকের কাছেই এক ভীষণ লজ্জার বিষয় হয়ে দাড়ায় তাই সরলীকরণ করতে লাগে ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)